শান্তির অনুসন্ধানে: অন্তরের মহাশূন্যতা এবং বাইরের দৌলতের খেলা
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম"
দুনিয়ার সকল প্রতিভার মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা হচ্ছে নিজের শান্তি নিজে বের করা। দুনিয়ার মানুষজন মৃত্যু অবধি “শান্তি”-কে পাওয়ার নেশায় ছুটে চলে। চাকরী করছে, ব্যবসা করছে, বিয়ে করছে, স্ত্রী-সন্তান বানাচ্ছে, অর্থ-সম্পদ গড়ছে, রিপুর অনুসারী হয়ে কামনাকে বাস্তবায়িত করছে, বিত্তের পাহাড় তৈরিতে মনোনিবেশ করছে, অট্টালিকা তৈরি করছে… কিন্তু তারপরেও শান্তি নাই। পেরেশানি ও উদ্বিগ্ন। চাই, আরো চাই… আরো চাই…। অঢেল অর্থ, যশ-প্রতিপত্তি, বিলাসিতা, সন্তান-সন্ততি তারপরও ব্যস্ততার শেষ নেই, দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই। মাদক, এলকোহল, যৌণতা, ক্লাব, ডিসকো, বিনোদন… না, কিছুতেই শান্তি নেই। সন্তান আছে কিন্তু তাদের সাথে যোগাযোগ নেই, অর্থ-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি সবই আছে কিন্তু তারপরেও কিছুই নাই। এক “মহাশূন্যতা” অন্তরকে চেপে ধরে আছে। নিঃসঙ্গতা এক ভয়ানক কষ্ট যার ভিতর নিমজ্জিত। অত্যাধিক পেরেশানীতে, একাকীত্বে থাকা অনেকেই আত্মহননের চিন্তা করে এবং করেও বসে। দরিদ্র দেশগুলো থেকে উন্নত দেশগুলোতে এই প্রবণতা আধিক্য। যদি জিজ্ঞেসিত হয়, “শান্তি কি”? তবে তারা নিশ্চুপ এবং অপারগতা প্রকাশ করে শান্তিকে সংজ্ঞায়িত করতে। আবার কম জানা বা অভাবীরা ক্ষমতা, বিলাসিতা, অধিক অর্থ-সম্পদ, সুন্দরী রমনী, পুত্র সন্তান ইত্যাদিকে শান্তি দাবী করে। এদের বুঝানো কঠিন যে এইগুলো শান্তি নয়। আত্মতৃপ্তি ও শান্তি ১৮০ ডিগ্রী পার্থক্য, এই বুঝটুকু খুব কম মানুষের। নিজের বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, অর্থ-বিত্ত, সামাজিক স্ট্যাটাস, বিলাসিতার জীবন অন্যদের দেখিয়ে, অন্যদের সাথে নিজের তুলনা করে আত্মতৃপ্তির জগতে বিচরণ আর মানুষের কাছে প্রমান করার চেষ্টায় ব্যাপৃত কতই না সুখে-শান্তিতে আছে আর ইহা যে মানসিক বিকারতা- সে বুঝ নেই। নিজেরা নিজেদের রিপুর দ্বারা শান্তির দরজা সবলে বন্ধ করে রেখেছে। দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষদের সুস্থ জীবন ধারণ করার সিস্টেম জানা নেই।
“শান্তি” সম্পূর্ণ অন্তরের ভিতরের সহিত সম্পর্কিত। যাদের অন্তরে শান্তিতে নাই তারা “লোক দেখানো”-তে মজায় মেতে থাকে। সম্মুখে কথা বলা বা সমীহ করার সময় অন্তরে ভালবাসা বিদ্যমান থাকলে সেটা সন্মান আর ভালবাসা না থাকলে সেটা তোষামোদ এবং “উদ্দেশ্য” হাসিলের উদ্দেশ্যে সমীহ করে যা চারপাশে লক্ষিত। মানুষদের মাঝে কেহ হিংসার ভিতর থেকে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠে, নিজের চাওয়া-পাওয়ার কাছে জগত অতীব তুচ্ছ, মানবতা যেখানে মূমুর্ষ, পরিবার যেখানে অবহেলিত। অন্যের ক্ষতি করার মাধ্যমে, অন্যকে হেয় করে, দাবিয়ে রেখে নিজেকে বড় মনে করা এবং আত্মগরিমার ভিতর মজে থাকার মধ্যে শান্তির অস্তিত্ব নাই। “চাই... আরো চাই... আরো চাই...” এই চাওয়ার আগুণ অন্তরে প্রবেশ করলে শান্তির দরজা ঐ অন্তরের জন্য চিরতরে বন্ধ। একই রকম হিংসুক, অহংকারী, লোভীদের অন্তরধারীদের।
বিবেক তৈরি হয় অন্তর ও জি-সত্তার প্যারামিটারের কম্বিনেশনে আর বিবেকের কার্যকারিতা ধারালো ও বলিষ্ঠ হয় অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। অন্যের কাজকর্ম ও কথার ধরণ দিয়ে নিজেকে সংযত করা। বিজ্ঞতা, অর্থের বড়াই, বিলাসিতার ভাব নেয়ার সাথে ভোগ করলেই হবে না, হতে হবে জাকজমকপূর্ণ ও প্রদর্শনযোগ্য। এই ভাব ও ভোগ যারা দেখায় তা স্বাভাবিকভাবে অন্যের ভাল লাগার কথা না। যখন নিজের জীবনে বড় সাফল্য আসে তখন “বিবেক” বোধ প্রয়োগ করে উচ্ছাস প্রকাশ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। নিজের কৃতিত্ব ও মোহড়া নেওয়াটা অবিবেচক এবং অসংবেদনশীল মনে করে। বিবেকের কারনে নিজেকে সংযত রাখে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, নিজে বিনয়ী হয়। “বিবেক” তীক্ষ্ণ করার ইহা একটি প্রসেস।
শান্তি তিন স্তরের। পরম শান্তি, প্রকৃত শান্তি, দুনিয়াবী শান্তি। যে যেই স্তরে নিজের “আমি”-কে মেলে ধরে সে সেই স্তরের শান্তি অন্তরে অনুভব করে। অন্তরের ডাইমেনশন ও মহাবিশ্বের ডাইমেনশন ভিন্ন ও আলাদা কিন্তু দেহ এবং দেহের মাধ্যমে ক্ষুধা, জৈবিক চাহিদা, মায়া, চিন্তা ইত্যাদির মাধ্যমে অন্তরকে মহাবিশ্বের পদার্থের সহিত সংযুক্ত করা হয়েছে। জীবন সংগ্রামের ভিতর অন্তরকে আবদ্ধ করে “আমি”-কে দুনিয়ার ভিতরে নিয়োজিত করা হয়েছে। এটা মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা। অখিল স্রষ্টার কারিশমার ক্ষমতাকে খুব কম মানুষই অনুধাবন করে।
পরম শান্তি অনুভূত হয় পরম আত্মার সান্নিধ্যে। আধ্যাত্মিক স্তরে পরম আমি-র উপস্থিতিতে পরম শান্তি অন্তরকে আচ্ছাদিত করে। এই শান্তি এমন এক অনুভূতি যেখান থেকে কেহ দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসতে চাইবে না; এমনকি মহাবিশ্ব পরিমান ক্ষমতা, স্বর্ণ, প্রখর যৌনশক্তির সহিত সুন্দরী রমণীদের দেওয়া হলেও কেহ এইগুলো চাইবে না, সে পরমাত্মার সহিত পরম শান্তির সহিত থাকতে চাইবে। দুনিয়ার সকল মানুষ একই সাথে পরম আধ্যাত্মিকতার উদ্দেশ্যে ধ্যানে মগ্ন হলে খুব অল্প সংখ্যকই পাওয়া যাবে, যারা পরম আত্মার সান্নিধ্যে গিয়ে পরম শান্তিকে অনুভব করতে সামর্থ্য হবে। পরম শান্তির উপরেও আছে “পরম পরম…… শান্তি”। তবে সেখানে দুনিয়ার কেহ পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে না। আধ্যাত্মিকতার সমাপ্তি পরমাত্মা পর্যন্ত। যারা পরমাত্মার স্তরে পৌছাতে পারে তাদের কেহ বুঝতে পারে পরম শান্তির উপরেও আরো উপরের স্তর রয়েছে আর সেই স্তর মৃত্যুর পর্দার দিয়ে ঢাকা। পরমাত্মার স্তরে “আমি” ও “সত্য”-র রহস্যের দ্বার খুলে।
প্রকৃত শান্তি অনুভূত হয় জাগ্রত অবস্থায় নিজের “আমি”-র সত্তার সান্নিধ্যে। “আমি” এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও শান্তিময়। অন্তরের প্যারামিটারগুলো বাধাগ্রস্থ করে এই সুন্দর ও শান্তিকে অনুভব করতে। অন্তরের বদ প্যারামিটারগুলো সম্পূর্ণরূপে নিস্তেজ না হলে এই সান্নিধ্যে যাওয়া যায় না। জীবন সংগ্রামের ভিতর থেকে এই স্তরে নিজেকে নিয়ে যেতে হয়।
মারিয়ানা ট্রেঞ্চ সমুদ্রের গভীরতম স্থান। ১১.০৩৩ কিমি গভীর এবং চির অন্ধকার। ফ্ল্যাট ফিশ, আই ফিশ, ড্রাগন ফিশ, ডাম্বো অক্টোপাসদের বসবাস ঐ অঞ্ছলে। এই মারিয়ানা ট্রেঞ্চে বসবাসরত প্রানীরা জানে না এগার কিমি উপরে পানির সারফেইসের উপর দীপ্যমান এক সূর্য রয়েছে। মানব জাতির সকলেই দুনিয়ার পৃষ্ঠে অবস্থান করলেও অর্থ, ভোগ, হিংসার কারনে সকলেই মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ন্যায় চির অন্ধকারে নিমজ্জিত। অন্তর চির অন্ধকারের ভিতর থাকার সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে “কামনা” এবং “মায়া”। লোভ, হিংসা, কামনা, অহং ইত্যাদি প্যারামিটারগুলো সম্পূর্ণ নিস্তেজ না করলে অন্তর “আমি”-র স্তরে পৌছে প্রকৃত শান্তির সান্নিধ্যে আসতে পারে না। আর এই প্যারামিটারগুলোর ওজন অত্যাধিক। অন্তর সম্পূর্নরূপে ওজনমুক্ত ও পবিত্র না হলে আমি-র সান্নিধ্যে আসতে বাধাগ্রস্থ হয় ও প্রকৃত শান্তির দরজা বন্ধ থাকে। যার লোভ, হিংসা, কামনার পরিধি ও জগত যত বড় তার অন্তর তত বেশী অন্ধকারে নিমজ্জিত। জীবন নির্বাহ করতে হবে প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে কিন্তু কামনা, হিংসা, লোভের বশবর্তী হওয়ার মানে হলো নিজের শান্তি নিজেই ধ্বংস করা।
দুনিয়াবী শান্তি অন্তরের ভাল প্যারামিটার মাধ্যমে প্রকাশিত এবং সৎকর্ম, উৎকৃষ্ট কথা ও উত্তম চিন্তার সহিত সম্পর্কিত। “সৎ উপার্জন” ও “সৎ জীবনযাপন” অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সন্তান মাবাবার অনুগত হলে ইহা এক প্রশান্তি। সন্তান আচরণ ও কথার মাধ্যমে বিবেকসম্পন্ন শিষ্টাচার প্রকাশ করার সাথে প্রতিবেশী, আত্মীয় সকলের কাছে গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করলে- ইহা মাবাবার শান্তি। স্বামী-স্ত্রী “তাকওয়া”-র ভিতর অবস্থান করলে সেই স্বামী-স্ত্রী দুজনের শান্তি। অন্যের কষ্টকে হৃদয়াঙ্গম করার মাধ্যমে ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা হলো শান্তি। অসহায় পরিবারকে দান করার মাধ্যমে রিজিকের ভরণপোষণের স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো শান্তি। আর সেই দান গোপন ভাবে করা আরো উত্তম। নিজ আচরণ ও পরোপকারের মাধ্যমে মানুষের ভালবাসা অর্জন হলো শান্তি। মোক্ষম সময় ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া হলো শান্তি। স্ত্রীর নম্রতা ও বিনয় স্বামীর জন্য শান্তি, স্বামীর নম্রতা ও বিনয় স্ত্রীর জন্য শান্তি।
সরলতা ব্যতীত শান্তি আসে না আর কঠোর অন্তরধারীদের অন্তরে শান্তি প্রবেশ করে না। তেমনি ভোগ-বিলাসী লোকদের অন্তরে শান্তি প্রবেশ করে না। শান্তিপ্রিয় মানুষজনের বৈশিষ্ট্য হলো, ক্রোধের সময় ক্ষমা করে আর চরম দরিদ্র ও কষ্টের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
তবে সবশেষ আমাদেরকে শান্তির পথ দেখাতে পারে ইসলাম। আপনার জীবনে ইসলামের বিধি বিধান মেনে চললে নিশ্চয়ই শান্তি খুঁজে পাবেন।
Islam is the ultimate solution .
- Juhany (AH Jony)
Comments
Post a Comment