৩০ লাখ: একটি রাজনৈতিক অস্ত্র

             বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম 


বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বিতর্কিত উপাদান হলো "৩০ লাখ শহীদ"—একটি সংখ্যা যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ এ সংখ্যার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুললেই কেউ জাতির শত্রু হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো—এই ৩০ লাখ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

একটি ম্যাসাকার বনাম একটি সংখ্যা

অনেকে বলেন, “সেনাবাহিনী যদি ৩ লাখ মারে, তাও ম্যাসাকার। ৩০ লাখ হলেও তো ম্যাসাকার।” তাহলে সংখ্যাটা নিয়ে এত জেদ কেন?

উত্তরটা সহজ—৩০ লাখ একটি রাজনৈতিক ছাউনি, একটি প্রতিরোধের দেয়াল। এর পেছনে আছে মুক্তিযুদ্ধ-নির্ভর রাজনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, যা প্রশ্নাতীত হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র সংখ্যার দাপটে। এই সংখ্যার পেছনে কোনো পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত রেফারেন্স নেই। কিন্তু সংখ্যাটি অচল ‘টাকা’র মতো হলেও, তার বাজারমূল্য প্রচণ্ড।

জুলাই বনাম একাত্তর

ধরা যাক, জুলাই মাসে (উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত) রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় ২০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। অনেকেই বলেন, এই সংখ্যা বাস্তবে ১০০০-১৫০০। এই সংখ্যাটি যদি সত্য হয়, তাহলে কেন সেটা আমাদের জাতীয় বিবেক নাড়িয়ে দেয় না? কারণ, তার পাশে দাঁড় করানো হয়েছে এক অতিমানবীয় সংখ্যা—৩০ লাখ। ফলে, যেকোনো নতুন গণহত্যা—তা যত বড়ই হোক না কেন—তুচ্ছ হয়ে যায় এই এক সংখ্যা দ্বারা।

এই জায়গাটাই মুক্তিযুদ্ধ-নির্ভর রাজনীতির “অভেদ্য দুর্গ”। কারণ যতদিন ৩০ লাখ অটুট থাকবে, ততদিন ১-২ হাজার, এমনকি ১০ হাজার মানুষ মারা গেলেও তা হবে 'কম'।

গণহত্যার র‍্যাংকিং ও রাজনৈতিক পুঁজি

আসুন, একটা অস্বস্তিকর কিন্তু বাস্তব তুলনা করি।

  • মুজিব সরকার বিরোধী দল দমন করতে হত্যা করেছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
  • ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হয়েছে ১০-১৫ লাখ মানুষের।
  • শেখ হাসিনার শাসনে গুম-খুন-ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার
  • ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নারী।
  • পিলখানা ট্র্যাজেডি, শাপলা চত্বর, মোদিবিরোধী বিক্ষোভ ও ২৮শে অক্টোবরের মতো ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
  • করোনাকালে অব্যবস্থাপনা ও দুঃশাসনের কারণে প্রাণ গেছে আরও লক্ষাধিক মানুষের।

সবমিলিয়ে, “বাপ-বেটি” মিলে মেরে ফেলেছে প্রায় ১৭-১৮ লাখ মানুষ। কিন্তু তার পরও এই ‘গণহত্যা সমষ্টি’ ৩০ লাখের কাছে পরাজিত। কারণ ৩০ লাখ ‘অতীতের পবিত্রতা’র নামান্তর। এ সংখ্যা একবার মেনে নিলে তার পাশে আর কোনো অন্যায়ের জায়গা হয় না।

মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রির অমোঘ ঢাল

একটা প্রশ্ন আমরা এড়িয়ে চলি—যদি ৩০ লাখ নয়, বরং ৩ লাখ হয়, তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধের 'মরাল কারেন্সি' আগের মতো থাকে?

এ প্রশ্ন শুনলেই মুক্তিযুদ্ধের অনেক ‘রক্ষক’ ক্ষিপ্ত হন। কারণ তারা জানেন, একবার যদি সংখ্যাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে মুক্তিযুদ্ধ-নির্ভর রাজনীতির সার্বভৌমতা ভেঙে পড়বে।

এনসিপি ও ভিক্টিমদের স্বীকৃতি সংকট

২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা গুম-খুন-ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তারা আজও জাতীয় স্বীকৃতির বাইরে। একাত্তরের নামে সব দায়মুক্তি—কিন্তু বাকশাল বা আওয়ামী অপশাসনের শিকাররা যেন পরজীবী।

একাত্তরের গল্প যেখানে শুরু বায়ান্ন থেকে, সেখানে ‘জুলাই’ কেন আজও জাতীয় স্মৃতির পাতায় জায়গা পেল না? কারণ ৩০ লাখের ন্যারেটিভ ভাঙলেই এই প্রশ্নগুলো একে একে সামনে চলে আসবে।

৩০ লাখের রাজনীতি

শেষমেশ, এটা বুঝে নেওয়া জরুরি—৩০ লাখ একটি পবিত্র মিথ, একটি অলঙ্ঘনীয় সংখ্যা। এই সংখ্যার আড়ালে ঢেকে রাখা হয়েছে:

  • দুর্নীতির পাহাড়,
  • রাষ্ট্রীয় অপরাধ,
  • স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা।

সুতরাং ৩০ লাখকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে শুধু ইতিহাস নয়, পুরো মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রির নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। একে জিইয়ে রাখতে হবে, না হলে রাষ্ট্র-দল-মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভেঙে পড়বে।


⚙️ ফুটনোট / সূত্রসমূহ

  1. Hamoodur Rahman Commission Report — পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গোপন তদন্ত রিপোর্ট (২০০০ সালে ফাঁস)। নিহত সংখ্যা: ২৬,০০০–১,৪০,০০০।
    https://en.wikisource.org/wiki/Hamoodur_Rahman_Commission_Report

  2. Sarmila Bose, "Dead Reckoning" (2011) — গবেষণাভিত্তিক বই; অনুমানিত নিহত: ৫০,০০০–১ লাখ। ISBN: 9781849040011

  3. R.J. Rummel, "Statistics of Democide" — পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ৩ লাখের নিচে প্রাণহানির তথ্য। https://www.hawaii.edu/powerkills/SOD.CHAP8.HTM

  4. The Blood Telegram — আর্চার ব্লাডের মার্কিন তারবার্তা (1971)। ৩০ লাখের তথ্য নিশ্চিত নয়।

  5. Lawrence Lifschultz, "The Unfinished Revolution" — ১৯৭৪ দুর্ভিক্ষে মৃত্যু: ১০-১৫ লাখ।

  6. Human Rights Reports (HRW, Amnesty, Odhikar) — শেখ হাসিনার সময়ে গুম-খুন: ~২০ হাজার। https://odhikar.org

  7. Anthony Mascarenhas, "The Rape of Bangladesh" (1971) — পশ্চিমা সাংবাদিক, গণহত্যার রিপোর্ট, তবে ৩০ লাখ নয়।


এই লেখাটি বিতর্কিত হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের সত্য কখনো সংখ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। সত্য প্রশ্ন চায়, প্রমাণ চায়, ব্যাখ্যা চায়। ৩০ লাখের দাবিও তার ব্যতিক্রম নয়।


✍️🗓️০৩ জুন ২০২২

Comments