ইরান ও আফগানিস্তান: ইসলামি বিপ্লব, শিক্ষা ব্যবস্থা ও টিকে থাকার সংকট

                বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম 

ইরানের ইসলামি বিপ্লব এক সময় মুসলিম বিশ্বের জন্য ছিল এক অনন্য অনুপ্রেরণা। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরশাসন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র যখন ইসলামের নামে নিজেকে পুনর্গঠন করেছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিল—এটাই হয়তো ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার সফল মডেল। কিন্তু আজ সেই বিপ্লবী রেজিম কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন উঠছে—কেন?

অনেকে সহজ উত্তর দেন: আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রভাব, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপ। নিঃসন্দেহে এগুলো বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সব কিছুর চেয়েও গভীর একটি সমস্যা ইরানকে ভিতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করছে—জনগণের ক্ষোভ। এই ক্ষোভ শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতি থেকে জন্ম নেয়নি; এর শিকড় আরও গভীরে, সমাজ ও চিন্তার স্তরে।

১. ইসলামি বিপ্লব, কিন্তু ইসলামের এসেন্স অনুপস্থিত

ইরান একটি শিয়া ইসলামি বিপ্লব করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিপ্লব কি ইসলামের এসেন্স অব জাস্টিস (ইনসাফ), নৈতিকতা ও আত্মিক শক্তি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে?

একটি বিপ্লব শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নাম নয়। বিপ্লব টিকে থাকে তখনই, যখন জনগণ আদর্শিকভাবে শক্তিশালী হয়। যদি মানুষ কেবল আইন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে “ধার্মিক” হতে বাধ্য হয়, কিন্তু অন্তরে ইসলামের ন্যায়, সাম্য ও আত্মসংযমের চেতনা গড়ে না ওঠে—তাহলে সেই বিপ্লব দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

ইরানে দেখা যায়, রাষ্ট্র ইসলামের নাম ব্যবহার করেছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামকে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক নৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ধর্ম হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে চাপ, ভালোবাসার বিষয় নয়। এই জায়গাতেই ক্ষোভ জন্ম নেয়।

২. শিক্ষা ব্যবস্থা: বিপ্লবের সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তি

ইরানের সংকট বুঝতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকানো জরুরি। একটি বড় দ্বন্দ্ব এখানে স্পষ্ট—রক্ষণশীল ইসলামি বিপ্লব, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় পশ্চিমা লিবারেল কাঠামো।

লিবারেল শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের চিন্তায় ব্যক্তি-স্বাধীনতা, ভোগবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আপেক্ষিক নৈতিকতার বীজ বপন করে। অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লব চায় আল্লাহকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা, শালীনতা ও সামষ্টিক দায়িত্ববোধ। এই দুইয়ের সহাবস্থান স্বাভাবিকভাবেই সংঘর্ষ তৈরি করে।

এই সংঘর্ষের ফল আমরা দেখি ইরানি তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে। একজন ইরানি মেয়ে যখন খোমেনির ছবি পুড়িয়ে সেই আগুন দিয়ে বিড়ি ধরায়, তখন সেটাকে শুধু “বিদ্রোহ” বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি সেন্স অব ডিপ্রাইভেশন—যেখানে শিক্ষা তাকে পশ্চিমা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দেয়নি। ফলে সে ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্র-আরোপিত ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

আফগানিস্তান: কঠোরতা, কিন্তু একটি যুক্তি

আফগানিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা আছে। বিশেষ করে তালেবান সরকারের নীতিকে অনেকেই অমানবিক ও পশ্চাদপদ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু বিষয়টি শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে নয়, তাত্ত্বিকভাবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি সামনে আসে।

আফগানিস্তান মনে করে—একটি ইসলামি বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ইসলামিক আদর্শের ওপর গড়ে তুলতে হবে। আধা-ইসলামিক, আধা-সেকুলার শিক্ষা দিয়ে ইসলামিক জাতিগঠন সম্ভব নয়। তাদের দৃষ্টিতে, শিক্ষা যদি পশ্চিমা লিবারেলিজমে বিষাক্ত হয়, তাহলে সমাজও বিষাক্ত হবেই।

এখানে আফগানিস্তানের পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তাদের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে কোনো আদর্শিক রাষ্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করে। শিক্ষা যদি আদর্শবিরোধী হয়, তাহলে বিপ্লবের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

মানুষের খাসলত ও ইসলামি রাষ্ট্রের বাস্তবতা

মানুষের স্বভাবই হলো—সে কখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকে না। শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বা সামাজিক সুবিধা দিলেই মানুষ আদর্শিকভাবে অনুগত থাকবে, এমন ভাবা ভুল। যদি সমাজকে পশ্চিমা লিবারেল ভোগবাদি আদর্শ থেকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে মানুষ তুলনা করবেই—আর সেই তুলনা থেকেই জন্ম নেবে অসন্তোষ।

একটি ইসলামি রাষ্ট্র যদি সত্যিই টিকে থাকতে চায়, তাহলে তাকে শুধু আইন দিয়ে নয়, চিন্তা ও চেতনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর সেই চেতনার মূল কারখানা হলো শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা যদি সেকুলারিজমমুক্ত না হয়, তাহলে সমাজ ধীরে ধীরে আদর্শহীন হয়ে পড়বে—রাষ্ট্র যতই ইসলামি নাম বহন করুক না কেন।

উপসংহার:

ইরান ও আফগানিস্তান—দুই ভিন্ন পথ, দুই ভিন্ন বাস্তবতা। ইরান আপস করেছে, আফগানিস্তান কঠোর হয়েছে। কিন্তু উভয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট করে শেখায়—ইসলামি বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষা, আদর্শ ও সমাজব্যবস্থার মধ্যে কোনো মৌলিক দ্বন্দ্ব রাখা যায় না।

ইসলাম শুধু শাসনের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। আর সেই দর্শন যদি মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া না যায়, তাহলে কোনো বিপ্লবই চিরস্থায়ী হয় না।


✍️ Mohammad Juhany 

11/01/2026

Comments